Analysis

অভিষেকের অধঃপতন : বিপদে তৃণমূল – চিন্তিত মমতা -বুঝিয়ে দিলেন দল আগে ভাইপো নয়”পর্ব-৩”

মমতা বুঝলেন সরকারী জনপ্রিয়তা কুড়ানোর চেয়ে দলের দিকে নজর দেওয়া দরকার, নাতো ঘোর বিপদ !

দক্ষিণ ২৪ পরগনা সহ রাজ্যের একাধিক নেতার অভিযোগে অভিষেকের ক্ষমতা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিলেন মমতা , তিনি বুঝলেন কেউই অভিষেক কে ভালো চোখে দেখেন না।থামিয়ে দিলেন অভিষেকের রথ , বিপদ অসন্ন্য বুঝলেন তাই অভিষেকের ডানা ছাটলেন নির্মম ভাবে যা অভিষেকও আন্দাজ করতে পারেন নি।ভোট বাজারে শুভেন্দু ডাহা ফেল করলেও কিন্তু মমতা ভরসা রাখলেন তারই ওপরে , বুঝিয়ে দিলেন মমতা- দল আগে ভাইপো নয় ।

২০১৪ পর্যন্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা ছিলো না। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের পর অভিষেক নিজের বলয় তৈরী করতে শুরু করেন অভিষেক , মূলত কিছু ব্যবসায়ী , প্রোমোটার ও প্রশাসনের কিছু কর্তা ব্যক্তি এই বলয়ের মূল কারিগর সঙ্গে তার পরিবার- অভিযোগ এমনটাই । ভাবনা ও চিন্তার পরিবর্তন ঘটে যায় নিমেষের মধ্যে , শুরু হয় আধা কর্পোরেট আধা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। জেলা ও রাজ্যের নেতারা প্রায় সবাই স্নেহের চোখে দেখা অভিষেকের পরিবর্তনে হকচকিয়ে উঠলেও প্রকাশ করলে দিদি যদি খেপে যায় সেই ভয়ে কেউই মুখ খোলে নি কোন দিন , কিন্তু অভিষেক এই বিষয় আন্দাজ করে নিজের লোকসভার অঞ্চলের নেতা দের পরিবর্তন ঘটিয়ে কিছু আনকোরা, বয়স বেশি হলেও যুব হিসাবে নিযুক্ত করেন। বাদ পড়লো ১৯৯৮ থেকে তৃণমূল করা মমতার সাথে একসাথে দল করা নেতারা।

প্রথমে ২০১৪ সালের পুজোর পর এর এই সব নেতাদের তেমন মিটিং এ গুরুত্ব থাকতো না। প্রথমত অভিষেকের নিরাপত্তার নামে বড্ডো বাড়াবাড়ি ব্যবস্থা , পুলিশের হাতে তালিকা থাকতো করা ঢুকবে আর করা ঢুকবে না- এই বিষয়টি অনেক পুরানো নেতার অপছুন্দ হলেও মেনে নিতে বাধ্য। জেলার পুরোনো নেতারা জানতো না কি পরিকল্পনা নেওয়া হবে আগামীতে , কোথায় এমপি যাবেন কার সাথে মিটিং করবেন , কি কাজ হবে – সব মিলিয়ে বহু বিতর্ক হলেও মুখ বন্ধ হয়ে গেছিলো।

লোকসভার অন্তর্গত ৭জন বিধায়কের এর মধ্যে সোনালী গুহ প্রথম দিকে একটু ছাড় পেলেও পরে মমতার সাথে দূরত্ব তৈরী হওয়ায় সেই সুযোগে আর সোনালীর ছিল না যা অভিষেকের কথার অমান্য করে। এমন কি বিধায়করা কি কাজ করবে তার নিদান দেবে অভিষেক , প্রথমে দিকে হালকা অভিমান পরের দিকে হুমকি। অবস্থার আরো অবনতি হয় ২০১৬ বিধান সভার পর , জেলার নেতা সহ রাজ্যের নেতাদের প্যারালাল যুব বাহিনী তৈরী করে অভিষেক। রাজ্যের বহু সিদ্ধান্ত নিতে হতো অভিষেকের কথায় , নাতো পদ যেতে পারে নিমিষেই ।

তৃণমূল যুবর নামে দাদা গিরি দলে বেড়ে যাচ্ছে এই খবর চাপা না থাকলেও মমতার পরম স্নেহ আরো অত্যাচারী করে তোলে অভিষেককে , অভিষেক হয়ে ওঠে বেতাজ বাদশা। অনেকে তৃনমুলে “যুগ অভিষেক” বলেই আড়ালে আবডালে মজা করতো , আর তার মাঝে একদল ব্যবসায়ী যারা অভিষেক বন্দনার মধ্যেদিয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন আর দ্রুত বেড়েছে দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে দূরত্ব । দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে দলের মধ্যে , দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে এই নতুন নেতারা কারা , মূলত ব্যবসায়ী রা তাদের বৈধ্য-অবোধ্য কারবার ফুলে ফেঁপে ওঠেছে এই ধরণের একটা অভিযোগ ২০১৬ থেকে বেড়ে চলেছে।

২০১৭ থেকে অনেক নেতার কালীঘাট যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায় , কারণ গজিয়ে উঠেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা সহ সারা রাজ্যে অভিষেক বলয়। এই বলয় এড়িয়ে কোনো অভিযোগ করা যাবে না মমতা ব্যানার্জীকে , তাহলেই পুরানো পুলিশ ফাইল বেরিয়ে পড়তে পারে এই ভয় থাকতো রাজ্য জুড়ে। শুধু ডায়মন্ড হারবার লোকসভার দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে এলাকা ভিত্তিক তৃণমূল যুবর নেতারা চালাচ্ছে রাজত্ব , যেমন ডায়মন্ড হারবারে গৌতম অধিকারী , ফলতায় জাহাঙ্গীর , বজবজে শ্রীমন্ত বৈধ্য সহ একাধিক নেতারা উঠে এসেছে – যাদের অনেকেরই ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে বলে খ্যাতি আছে। মূলত এরাই হল অভিষেকের মূল মানুষ যাদের বাদ দিয়ে অভিষেক কোনো কাজ করতো না, এই সুযোগে তৃণমূল যুবর নাম করে যারা রাজত্ব চালাচ্ছে জেলা জুড়ে এবং এই মডেল বিভিন্ন জেলা তে কায়েম করতে গেলে দন্ধ বাধে বহু নেতার সাথে। অনেকে দলের সাথে সম্পৰ্ক ছিন্ন করে বসে যান ২০১৮ এর গোড়ার দিকে।

২০১৮ শুরুর দিকে পঞ্চায়েতের নির্বাচন, এই ক্ষেতে জেলার নেতাদের শুধু আজ্ঞাবাহক হিসেবেই রাখা হয় , আর নেতৃত্বের সম্পূর্ণ অধিকার চলে যায় তৃণমূল যুবর হাতে। বিবাদ শুরু হয় চরমে , বিধায়ক দের সাথে মুখ দেখা দেখি বন্ধ।অভিযোগ বিধান সভায় চলতো নজরদারী- যদি দিদির কানে যায় তাহলে নিস্তার নেই , বিধায়কের অনুগামীদের মাধ্যমে পৌঁছে যেত হুমকি আর সব কিছু চুপ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৭ টি বিধানসভার প্রায় ৫৭ জন নেতা যারা এক সময়ে মমতার সাথে দল করেছেন তারা বিক্ষুব্দ হলেও বেশি কিছু করে উঠতে পারেননি , অনেক নেতা কর্মীর পরিবার পঞ্চায়েতে ভোট দিতে পারেন নি। তৃণমূল যুবর না পসন্দ কাজ এই রাজ্য চলবে না – এই ফরমান অঘোষিত ভাবে ঘোষিত হয় ।

জেলার অন্যতম নেতা সুভাশিষ চক্রবর্তী রাজ্য সভায় মনোনীত হবার পর নতুন পুরোনোর সম্পর্কহ আরো পৌঁছেছে তলানিতে। সুভাশিষ মমতা ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অনেকে সুভাশিষ কে অনুরোধ করতো দিদি কে কিছু বলার ডায়মন্ড হারবার সম্পর্কে , সুভাশিষ নাকি বলতো ‘ওটা কেদ্র শাসিত অঞ্চল আমার কিছু করার নেই’ – এটা নিছক মজা নয় কঠিন বাস্তব সেটা হারে হারে টের পান জেলার পুরানো নেতারা।

এবারের লোক সভা নির্বাচন থেকে সরকারি উদ্বোবধন কোনো সভাতেই অভিষেকের অনুমতি ছাড়া কেও মঞ্চে ওঠেনি , বহু সভাতে দেখা গেছে রাজ্যের বড় নেতারা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে , কিন্তু আসল খবর ওনাদের মঞ্চে ওঠার অনুমতি ছিল না – তালিকা ছিল পুলিশের কাছে। মুকুল রায় , শোভন চ্যাটার্জী দলে না থাকাটা আরো বিপদের দিকে নিয়ে গেছে অভিষেক ও পুরানোদের সম্পর্ক।

অভিষেকও অনুমান করেছিলেন তার বিপক্ষের স্বর অনেক ভারী হয়েছে , ভোটার পালকি ডুবতে পারে তাই পশাসনের একাংশ ও তৃণমূল যুবর হাতেই দিয়েছিলেন ভোট করানোর ভার। সিপিআইএমের প্রার্থী ফুয়াদ হালিম একাধিক বার বার আক্রান্ত হন গৌতম অধিকারীর দ্বারা , পুলিশ কে অভিযোগ জানালেও পুলিশ নীরব থেকেছে – আর গৌতম , জাহাঙ্গীর , সীমান্ত বৈদ্যরা বুকের ছাতি চওড়া করে দাপিয়ে বেরিয়েছে বিরোধী থেকে তৃণমূল কর্মীর ওপর, আর এই করেই এবারের বৈতরণী পার হলেন অভিষেক।

মমতা ব্যানার্জী কিছুটা আঁচ করতে পারলেও পুরোটা আন্দাজ করতে পারেন নি বা মমতা কেও কোন বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়েছে যাতে আসল টা না প্রকাশ প্রায়। তৃণমূলের অনেকেই এটাকে একটা চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন বলে মনে করেন। কেন বিক্ষুব্ধদের কথা জানতে দেওয়া হলো না জেলায় জেলায় , কি কারণ ? কারা এর পিছনে আছেন ? শুভেন্দু, ববি , অরূপ , অনুব্রত , পার্থ এরা সবাই দিদির কাছের লোক হলেও অভিষেকের ব্যবহারের জন্য অনেকেই দূরত্ব রেখে চলেন । প্রবীণ সুব্রত মুখার্জী থেকে আইনজীবী কল্যাণ কখনই ভালো চোখে অভিষেক কে নেয় নি, ফলে বিড়ম্বনা বেড়েছে মমতা ব্যানার্জীর অভিষেক কে নিয়ে।

দলের এক প্রবীণ মমতা সহযোগী শ্রমিক আন্দোলনের নেতা বললেন আগে মনে হয়েছিল অভিষেক সন্তান সম ওর প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব আছে আর ওই বোধ হয় আগামীর নেতা , কিন্তু দলের সম্পদ না হয়ে বিষের ভান্ড হবে তা বুঝি নি, দিদি একদিন বিঝতে পারবেন – তবে বেশি দেরি হলে সংশোধনের জায়গা পাবে না দিদি। দিদি যদি নিজে না দলের হাল ধরেন তাহলে অনেক নেতাই বিজেপি তে চলে যাবে , কত দিন আর অপমান সহ্য করা যাবে। (চলবে)

Show More

Related Articles

Back to top button
Close