Analysis

মা আসছে ‘ ৫৪ দিন বাকি : পুজোর গান হারিয়ে গেছে বাঙালির মন থেকে , জোর বিতর্ক কে দোষী শ্রোতা না স্রষ্টা !

"এই বিতর্কের শেষ নেই" অভিনেতা ও গায়ক অর্জুন চক্রবর্তী , ওস্তাদ জয়নুল আবেদীন , ভাস্কর রায় ও পিলু ভট্টাচার্য "পর্ব -১ "

পুজো আর বেশি দূরে নেই রেল লাইনের ধারে কাশ ফুলের দোলা, বাগানে শিউলির কুঁড়ি জানান দিচ্ছে ৷ বাজারে এসে যেত একেবারে আনকোরা নতুন পুজোর গান শরতের আলোর বাঁশি বেজে উঠলেই নতুন জামা কাপড়ের সঙ্গে৷স্বর্ণযুগের হেমন্ত-মান্না-শ্যামল-মানবেন্দ্র-অংশুমান রায় ,বাপি লাহিড়ী, নির্মলেন্দু চৌধুরীদের মতো আদৃত না হোক পরে শ্রীকান্ত-লোপামুদ্রা-রাঘব-পিলু -রূপঙ্কর- ভাস্কর -অনুপম-শুভমিতাদের কয়েক বছর আগে প্রকাশিত গান এখনও মানুষ কান পেতে শোনে৷ শ্রোতার মনে তবে পুজোর গানের সেই স্বর্ণালি দিন আর নেই৷

যুগের ডাকে কলের গানের কলকাতা সেই কবেই অতীত হয়ে গেছে, তারপর ক্যাসেট ,সিডি-ডিভিডির , ডিজিটাল ডিভাইস সঙ্গে ইউটুব আছে ফেস বুক৷দশ বছর আগেও পুজোর নতুন বাংলা গান বাজারে আসতো৷ পুজোর গান হারিয়ে বাঙালি এখন মজেছে ডিজিটাল সংস্কৃতিতে

অনেকটাই পাল্টে গেছে পরিস্থিতিটা প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনে ৷ বাড়িতে বাড়িতে কলের গানের মতোই এখন শো-পিস হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে রেকর্ড প্লেয়ার থেকে ক্যাসেট প্লেয়ার ৷চর্চায় আছে সিডি-ডিভিডি প্লেয়ারটা মাঝেমধ্যে গেয়ে উঠলেও তার পরমায়ু ফুরিয়ে এলো বলে৷ অতয়েব এখন পুজো এলে নতুন গান দূরের কথা, তাই শারদীয় সিডি-ডিভিডি প্রকাশের সংখ্যাও কমে গেছে৷এখন শিল্পীরা বাংলা ছবিতে গাইলেও বেসিক রেকর্ড, যাকে আমরা বাংলা আধুনিক গান বলে জানি, আর সেই ধারাটি ক্রমশ শুকিয়ে আসছে৷ কেন এমন হাল হচ্ছে আধুনিক গানের? স্মৃতির মনিকোঠায় রবীন্দ্র-নজরুল-অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্রলাল-রজনীকান্তের গানের বাইরে বাংলা গানের যে ধারা হিমাংশু দত্ত, সুধীন দাশগুপ্ত, সলিল চৌধুরী, শচীন দেব বর্মনদের হাত ধরে খ্যাতির শিখর ছুঁয়েছিল, তার উত্তরসূরিদের এমন হাল কেন ? কি বলছেন অর্জুন চক্রবর্তী , ওস্তাদ জয়নুল আবেদীন , ভাস্কর রায় ও পিলু ভট্টাচার্যরা :

অভিনেতা ও গায়ক অর্জুন চক্রবর্তী : যদি দেখি তাহলে ১৯৬৩ সালে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে তিনি প্রথম পুজোর গান রেকর্ড করেন৷ এর পর সলিল চৌধুরীর সুরে গাওয়া ‘পাগল হাওয়া’ বাংলা আধুনিক গানের একটি মুক্তো৷অনেক টাই পেরিয়ে এসে পাঁচ দশকের সেই গানের আবেদন কমেনি৷ ‘‘আসলে প্রযুক্তির এত দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে যে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বদলাতে পারছে না৷ এখন সকলের হাতে স্মার্টফোন৷ তাতে ইউটিউবের মাধ্যমে গান শোনা যায়, কিনতে হয় না৷ এর ফলে রেকর্ড কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ তাদের ব্যবসায় মন্দা থাকলে নতুন সিডি-ডিভিডি বেরোবে কী করে ? কিন্তু ব্যবসায়িক দিকটা দুর্বল হওয়ায় গানের চর্চা মার খাচ্ছে৷ এর ফলে ভালো গান তৈরির সম্ভাবনা কমছে৷প্রযুক্তির ভালো টা নিচ্ছে না , খারাপ টাই নিচ্ছে। মূল্য বোধ বলে কিছু আছে , নাতো একটা মহাপুরুষ দেখান যে এই শেষের ৭৫ বছরে এসেছে। যাকে দেখে আগামী প্রজন্ম এগোবে। নিষ্ঠা নেই, অনুশীলন নেই আর পারিবারিক চর্চার কথা বলে লাভ নেই। ভাষার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে , এই বাংলাতে বহু মানুষ সারা দেশ থেকে এখানে এসে বছরের পর বছর থাকছেন তাদের প্রভাব তো পড়ছে। তার ফলে ভাষার পরিবর্তন হয়েছে , আর সেই মত প্রয়োগ হচ্ছে। হতে পারলাম প্রাচ্য সংস্কৃতির মানুষ, না পারলাম পাশ্চাত্য সনস্কৃতির ধারক হতে।। তাই বাংলা গানেও আর সেই প্রাণ নেই । তবে এটা হবারই ছিল কারণ বিশ্বের দুয়ার যে আজি দোরগোড়ায়। ফলে নিষ্ঠার সাথে নিতে না পারলে বিকৃত রূপের সৃষ্টি হবে।

আমার মনে পরে সেই পুরনো হেমন্ত-মান্না-শ্যামল, সেই কিশোর-রফি-লতা-আশা-আরতি আর আর সেই আর ডি বর্মনরাই চোঙা থেকে পেল্লায় সাইজের বক্সে বেজে চলছে এত বছর পরেও। আগে ছোট্ট টেপ রেকর্ডারে গানের শব্দ কুড়ি ডেসিবেল পেরোলেই মা ঠাকুমার গলার পারদ চড়ে ‌যেত একশোর উপর। রান্নঘর বা ঠাকুরঘর থেকে হাঁক পড়তো এটা কি গৃহস্থবাড়ি না পাড়ার চায়ের দোকান? এখনতো সবাই একলা গান শোনা নিজের মতো করে তাও বাংলা গানের সৃজন কমে আসছে, এটাই বড় সংশয়ের। একটা দুটো গান মনে থেকে বাকিরা একবছরও মানুষের মনে জায়গা ধরে রাখতে পারছে না। এবারেও বিসর্জনের উদ্যাম নাচে বাজবে ৭৩-এর সেই পাগল করা ‘ঝিল কি উস পার’ ছবির গান ‘ দো ঘুট মুঝে ভি পিলাদে শরাবি’। আর বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবে আনন্দে মাতাল হবে সবাই। কী আছে এই গানে? ‌যে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী!

ওস্তাদ জয়নুল আবেদীন : এটা একেবারে একটা দুষ্টচক্র৷ব্যবসায়িক দিকটা দুর্বল হওয়ায় গানের চর্চা মার খাচ্ছে ”’ নতুন গানের ক্ষেত্রে এই ভাটা কেন? ‘‘পুরনো গানের সিডি-ই যদি বিশেষ বিক্রি না হয়, তা হলে নতুন গান প্রকাশের ঝুঁকি ব্যবসায়ীরা নেবেন কী করে? এখনও ভালো গান হচ্ছে, এ প্রজন্মের শিল্পীরা তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন৷ অনেক শিল্পী অনিয়মিতভাবে হলেও পুজোয় ইউটিউবে গান প্রকাশ করছেন৷ এতে রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি, রেকর্ডিং ও আনুষঙ্গিক খরচ এড়ানো যাচ্ছে৷ মোবাইল ডেটা ভারতে এখন খুব সস্তা হওয়ায় অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইউটিউব বা অন্য মিউজিক ওয়েবসাইট দেখায় বাধা নেই৷ সেখানে গান প্রকাশ করলে নিমেষে তা পৌঁছে যাচ্ছে শ্রোতার স্মার্টফোনে৷ প্রযু্ক্তির এই বিপ্লবের তত্ত্ব মেনে নিলেও সংগীতশিল্পী ওস্তাদ জয়নুল আবেদীন বেশি দোষ দিচ্ছেন বিপণন ও বাণিজ্যকে৷

তাঁর মতে, ‘‘গানের মান খারাপ হয়েছে এটা মানতেই হবে৷ শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে হবে না৷ সলিল চৌধুরী আমলে যে ভালো সুর ও লিরিক তৈরি হতো, এখন কি তেমন তৈরি হয়? এখন গান গাইতে গেলে সেই মানের কথা-সুর পাওয়া যায় না৷ তাই শুধু স্মার্টফোনে গান শোনা হচ্ছে বলে নতুন গান হচ্ছে না, এটা ঠিক নয়৷” ‘‘ভালো গান যারা তৈরি করতেন, তাঁরা সবাই চলে গেছেন৷ সে দিকে একটা ঘাটতি তো রয়েছেই৷”এই অবক্ষয়ের জন্য বিপণনকে দুষছেন ওস্তাদ জয়নুল আবেদীন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘এটা মার্কেটিংয়ের যুগ৷ সেই জন্যই নতুন বাংলা ছবির গান রমরমিয়ে চলছে৷ পুজোর গানের থেকে ছবির গানের প্রচার অনেক বেশি৷ প্রযোজকরা বিপুল টাকা ঢালছেন, তার জোরেই টিভি-এফএমের মাধ্যমে বারবার শুনিয়ে হ্যামার করা হচ্ছে৷ কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের প্রচার কই?৷”

একাধিক বাংলা মিউজিক চ্যানেল এবং কলকাতার বিভিন্ন এফএম স্টেশন খুললেই নতুন বাংলা ছবির গানই মূলত শোনা যায়৷ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এসব গানেরই রমরমা৷ তাই কখনও না-শোনা আধুনিক গান গণমাধ্যমে প্রচারিত না হলে শ্রোতারা গাঁটের কড়ি খসিয়ে এ সময়ের শিল্পীদের সিডি-ডিভিডি কিনবেন কেন? শুধু বাংলা নয়, হিন্দি গানের বেসিক রেকর্ডের ক্ষেত্রেও বিপদ ঘনিয়েছে একই কারণে৷ ‘‘হিন্দি গানের ক্ষেত্রেও দেখুন, শুধুই ফিল্মের গানেরই জয়জয়কার৷ ব্যক্তিগত অ্যালবাম, গজল সেভাবে নতুন করে তৈরি হচ্ছে কই? সুতরাং প্রযুক্তি নয়, বিপণন আর প্রচারই আসল ব্যাপার৷” আর শিল্পীদের অনুশীলন কই , নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা নেই , কিছুদিন গান বাজনা শিখেই প্রচারে চলে আসছে গায়ক হিসাবে। ভালো গান কিভাবে হবে। ভালো জাতের গাছ পুতলেই ভালো ফল আশা করতে পারাযায়।

ভাস্কর রায়: ” আমার পুজার ফুল মালা গাঁথা হয়ে গেছে ” বা ‘‘দাদা, কফিহাউসটা (মান্না দে-র ‘কফিহাউসের আড্ডা’) হবে নাকি?” ল্যাম্পপোস্টে বা বাঁশের মাথায় চোঙা।’ – এটাই বাংলার পুজোর গানের ছবি। সত্তরের দশকের সে ছবি একই রয়ে গেছে আজও।” আজও আমাকে বলে দাদা হয়ে যাক ” দাদা পায়ে পড়ি রে মেলা থেকে বউ এনে দে…”. পুজোর গানে বাংলা কি খুব একটা এগোয়নি? এ বিতর্কটা চলতেই পারে। থিম এসে খকিছুটা পরিবর্তন এসেছে , না এখন আর বাজে না সেভাবে পুজোর গান কারণ থিমের প্যান্ডেল আর সেই মতো আবহ তৈরী না করলে প্রাইজে আর আসবে না , ফলে কিছুর কমলেও তবে আজও পুজো প্যান্ডেলে বেজে চলেছে কিশোর, রফি, লতা, আশার গান। সে সময়ে পুজোর গানের অ্যালবামের উন্মাদনা ছিল আলাদা রকম। তখনও আসেনি সিডির চল, ক্যাসেটে বাজত গান।

তাঁরা এসেছিলেন তাঁদের সব অবিস্মরণীয় সুর আর গানের ডালি নিয়ে।আর ছিলেন গীতিকারেরা যাঁরা কোনদিন কবির স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু তাঁদের অসাধারণ কথার ওপর বাংলা গান রূপ পেয়েছিল একদিন। আজ তাঁরা অনেকেই বিস্মৃতপ্রায়।- অজয় ভট্টাচার্য, প্রণব রায় , মোহিনী চৌধুরী , শ্যামল গুপ্ত ,প্রবীর রায় , গৌ্রীপ্রসন্ন মজুমদার , পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় , মুকুল দত্ত-এঁরা বাংলা গানের কথাকে নতুন চেহারা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া সলিল চৌধুরী তো ছিলেনই। সেই সব গীতিকারদের কথাও একই সঙ্গে মনে পড়ে।

সেই সময় বাঙালি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকত পুজোর গানের জন্য। কিছুদিন আগে থেকেই প্রচারিত হত রেডিওতে সেই সব গান। তখন আরও একটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল, এইচ এম ভি প্রকাশিত শারদ অর্ঘ্য। পুজোর গানের বই।তখন বলতে গেলে রেডিওই এক মাত্র প্রচার মাধ্যম ছিল।“সেই সময়ের ডিস্কে প্রকাশিত পূজোর গান নিয়ে একটি আলাদা করে ইতিহাস রচিত হলে সেই সব গুণী মানুষদের প্রতি কিছুটা সম্মান জানান হত । কিন্তু বাঙালিতো নিজেদের ইতিহাস রচনায় ভয়ানক অনীহা, হয়তো কোনও সাহেব এসে সেটাও লিখে যাবেন।”

আমার আরেকটা মত আগে বছরে পুজোর সময় দুটো কিংবা ছাড়তে গান বেড়াতো আর সারা বছর মিলিয়ে সাত তা কিংবা আটটা গান প্রকাশ পেত। ফলে এই আটটি গান তৈরি হত সারা বছর ধরে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। কলের গান বা রেকর্ড যাই বলুন না কেন তখন কয়েকটি হাতে গোনা কোম্পানি ছিল। আর যখন ক্যাসেট এলো দাম কম বেশি গানের প্রতিযোগিতা শুরু করলো ক্যাসেট কোম্পানি গুলো, ফলে গানের চাহিদা বাড়ার সাথে সাপ্লাইও বাড়লো যেমন গায়কদের তেমন বাড়লো গীতিকার , সুরকার সঙ্গে বাজনদার দেরও। ফলে মান খুব নিন্ম মুখী হল তার কারণ যোগান বেশি দেবার জন্য। তাই দেখুন ১০০ তা গানের মধ্যে আজও ৯০ টা পুরানো গান আর ১০ টা নতুন গান রিয়ালিটি শোতে আজ চলছে।নতুন গান মনেরাখার মত খুব কম।

পিলু ভট্টাচার্য : আগে পুজোয় কার কার ক্যাসেট কোন কোন কোম্পানি থেকে বেরবে তার বিজ্ঞাপণ থাকত কাগজে। আর গানের মুখরা শুনিয়ে উৎসাহের পারদ চড়িয়ে দিত বিবিধ ভারতীর “অনুরোধের আসর” বা “মনের মত গান মনে রাখা কথাতে “। এইচ এম ভি,সাগরিকা, টি সিরিজ সহ নানা নামজাদা কোম্পানির ক্যাসেটের পোস্টারও পড়ত দেওয়ালে দেওয়ালে। আর ইলেকট্রনিকসের দোকানগুলোর সামনের শো-কেস ভরে ‌যেত পুজোর গানের ক্যাসেটে। উঠতি ‌যৌবন মৌমাছির মতো ভিড় জমাতো ক্যসেটের দোকানের মৌচাকে।

পুজোর পার্বনী আগে থেকে প্রায় জবরদস্তি আদায় করা হত দাদু ঠাকুরমার কাছ থেকে, নাহলেই ফুরিয়ে ‌যাবে স্টক পিছিয়ে পড়বে ‌যৌবন। হাতে পয়সা কম থাকত তখন তাই বন্ধু-বান্ধবীরা ভাগ করে কেনা হত ক্যাসেট, বিনিময় প্রথায় শোনা হত গান। সেই সময়ের চিরন্তন সেইসব গান আজ শুনে চলেছে আট থেকে আশি। তারপর এল সুমন, অঞ্জন দত্ত ,নচিকেতা শিলাজিতের ঢেউ আর তারপর বাংলাব্যান্ড। কিন্তু এখন ‌যেন একটু থিতিয়ে পড়ছে সেই গানের জোয়ার। কথা-সুরে মন মাতানো পুজোর গান ‌যেন হারিয়ে ‌যাচ্ছে বাঙালির পুজো থেকে। গান হচ্ছে কিন্তু তাতে রিমিক্সের হুড়োহুড়ি।আর তাই বোধহয় পুরনো চাল ভাতে বাড়ার মতো পুরনো গানেই মন ভরাতে হচ্ছে।

ছয় আর সাতের দশকে পুজোর আর একটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল, পুজোর গান। সেই সময় পেয়েছিলাম মন মাতানো কিছু শিল্পী সুরকার আর গীতিকারদের। সলিল চৌধুরী , নচিকেতা ঘোষ , অনিল বাগচি। সুধীন দাশগুপ্ত , রতু মুখোপাধ্যায় , অনল চট্টোপাধ্যায় ,অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সুরকারদের।আর শিল্পীরা ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় , মান্না দে , প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, , মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, বনশ্রী সেনগুপ্ত আরও অনেকে।

শনিবার স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফেরার পথে প্রত্যেক ঘর থেকে ভেসে আসত অনুরোধের আসরের সেই সব মাতাল করা সুর। বাড়িতে ফিরেও শুনতাম চলছে সেইসব গান। তখন কিছু বাঁধা ধরা অনুষ্ঠানের প্রতি ছিল সব বাঙালির এক অদম্য আকর্ষণ। যেমন শনিবার তিনটে থেকে সাড়ে তিনটে অনুরোধের আসর। রবিবার দুপুর আড়াইটে থেকে সাড়ে তিনটে আবার অনুরোধের আসর।সেই যুগটা ছিল শোনার যুগ। তখন দেখার চেয়ে শোনাই হতো বেশি। কাজেই শারদ অর্ঘ্যের ওই বইটিতে শিল্পীদের ছবিই ছিল শিল্পীদের চেনার একমাত্র মাধ্যম।পরিচিত বেশি ছিলাম তাঁদের গান আর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে।

পুজোতে সেভাবে আর গান প্রকাশের পরিকল্পনা থাকে না , কারণ সারা বছর ধরে গান প্রকাশ হচ্ছে , মানুষ এখন গান শোনে অনেক পরিমানে বেশি মোবাইলে দৌলতে। বিক্রি নেই তাই গান করবে কেন অডিও কোম্পানি গুলোর। কলকাতায় সিডি-ডিভিডির দোকান এখন সত্যিই হাতে গোনা৷ অতীতের পতাকা ধরে রেখেছে ধর্মতলার এম বিশ্বাস অ্যান্ড সিম্ফনি৷ তারা বলছে, গান শোনা কমেনি, বিক্রি কমেছে৷ কথাটা ভুল নয়৷ রাস্তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে বিভিন্ন বয়সের মানুষের কানে গোঁজা ইয়ারপ্লাগ দেখে মনে হবে এটাই বুঝি গানের স্বর্ণযুগ৷ এত সংগীতরসিক এ দেশে কবে কে দেখেছে? ‘‘গান শোনা না কমুক, বিক্রি তো কমেইছে৷ তাই অনেক সিনেমার গানের এখন ফিজিক্যাল রিলিজ হচ্ছে না, ডিজিটাল রিলিজ হচ্ছে৷ তবু কিছু সিডি-ডিভিডি বিক্রি হয়, সেটাও মূলত পুরোনো গানের৷ যারা ডিজিটালে স্বচ্ছন্দ নয়, প্রধানত তারাই ক্রেতা৷ এদের সৌজন্যে নতুন আধুনিক বাংলা গানও কিছুটা বিক্রি হয় বৈকি! তবে পুজোর বাংলা গান বলে বিশেষ কিছু নেই৷”

প্রযুক্তির উন্নয়নেই বাংলা গানের অবক্ষয়, এ কথা মানছেন না মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধাররা৷ স্বর্ণযুগের গীতিকার নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক তাঁর রেকর্ড কোম্পানি চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন৷ তাঁর মতে, ‘‘এটা একেবারে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়৷ বিনোদনের উপকরণ বেড়ে যাওয়ায় ভালো গানের সেই চাহিদা আর নেই৷ তবে গান শোনা আদৌ কমেনি৷ বিনা পয়সায় গান শোনার ঝোঁক বেড়েছে৷ তাই সিডি কোম্পানির ব্যবসা মার খাচ্ছে৷ এ সব কোম্পানি যেমন উঠে যাচ্ছে, সিডি-ডিভিডির দোকানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ হাতে গোনা যেসব দোকান খোলা আছে, সেখানে সিডির বদলে ইলেকট্রনিক গুডস্ বেশি বিক্রি হয়৷”

তবে সব মিলিয়ে বলা যায় , এখন ঠিক উল্টো, টিভির দৌলতে গান চিনি না, শিল্পী চিনি। দেখলেই মানুষ বলে দিতে পারেন ইনি কে। কিন্তু তাঁর চারটে গান মনে করতে দিনের বেলাও তারা গুনতে হবে। কিন্তু তখন যে কোনও শিল্পীর বহু গান মনে থাকত। এখনও আছে।অবসান হয়েছে সেই যুগের। সেই অনুরোধের আসর নিশ্চয়ই আর নেই। পুজো প্যান্ডেলে পুজোর গান বাজছে তা এখন ধূসর স্মৃতি। এখন মোবাইল আর আইপডে ডাউনলোড করা থাকে শ’খানেক গান। পথ চলতে কানে ইয়ারপ্লাগ গোঁজা আধুনিক প্রজন্ম, ধারণাই করতে পারবে না একটি ৭৮ আর পি এমের গালার চাকতিতে ধরা দুটি মাত্র গানও তখন কী উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারত।
প্রায় একশো বছর আগে শুরু হওয়া পুজোর গানের যুগটা হারিয়ে গেছে কবেই। এখনও শুনি নতুন পুরনো মিলিয়ে কিছু শিল্পীর কিছু গান পুজোয় প্রকাশিত হয়, কিন্তু কে তার খবর রাখে? আর সেই উন্মাদনাই বা কোথায়?

Tags
Show More

Related Articles

Back to top button
Close