Entertainment

আজও অধরা মহানায়ক বাংলা সিনেমাতে : ওপিনিয়ন টাইমস এর শ্রদ্ধার্ঘ্য

মহানায়ক উত্তমকুমার ৩৯ বছর হল চলে গেছেন , তার সিংহাসন আজও ফাঁকা, তবুও এখনো বাংলাতে মহা নায়ক এলো না

উত্তমকুমার সর্ব কালের সেরা অভিনেতা। তিনি মহানায়ক। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে যে কেউ ভয় পেতেন। কারণ উত্তমের মতো অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করা তো আর মুখের কথা নয়। আজও তাঁদেরকে ছবিতে দেখলে ভালবাসা একটুও কমে না।তাঁর ভুবনভোলানো হাসি, অকৃত্রিম রোমান্টিক চোখের দৃষ্টি আর অতুলনীয় অভিনয়ের গুণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও বাঙালি দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি মহানায়ক। উত্তম সব সময় প্রেমের দৃশ্যে সেরা। তবে জানেন কি মহানায়কও দুজন মানুষের সঙ্গে অভিনয় করতে ভয় পেতেন।

উত্তমকুমার ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ৫১ নং আহিরিটোলা স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন। দাদু আদর করে তাঁকে ডাকতেন উত্তম। তবে আসল নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তার বাবার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, মা চপলা দেবী। স্কুলে থাকতেই উত্তমকুমার তাঁর মহল্লায় নাট্যসংগঠন লুনার ক্লাব – এ জড়িয়ে পড়েন। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ নাটিকায় অভিনয় দিয়ে শুরু হয় মহানায়কের অভিনয় জীবন।উত্তম কুমারের আসল নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়।

তিন সন্তানের মধ্যে উত্তম কুমার ছিলেন সবার বড়। তার পিতার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম চপলা দেবী। তার ছোট ভাই তরুণ কুমার একজন শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন। তারা একত্রে বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচিত্রে অভিনয় করেছেন (যেমন: মায়ামৃগ, ধন্যি মেয়ে, সপ্তপদী, সোনার হরিণ, জীবন-মৃত্যু, মন নিয়ে, শেষ অঙ্ক, দেয়া-নেয়া, সন্ন্যাসী রাজা, অগ্নীশ্বর ইত্যাদি)। উত্তম কুমার গৌরী দেবীকে বিয়ে করেন, তাদের একমাত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায় মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান। গৌরব চট্টোপাধ্যায়, উত্তম কুমারের একমাত্র নাতি, বর্তমানে টালিগঞ্জের জনপ্রিয় ব্যস্ত অভিনেতা। ১৯৬৩ সালে উত্তম কুমার তার পরিবার ছেড়ে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বসবাস করেন, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে শুরু আর ১৯৮০ সালে এসে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে অভিনয় করার সময় জীবনাবসান।অকাল বিদায় মাত্র ৫৪ বছরের ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী অভিনেতা উত্তম কুমার চলচ্চিত্র শিল্পকে দিয়েছেন ৩২ বছর।

১৯৪৮ সালে মাত্র সাতাশ টাকা পারিশ্রমিকে নীতিন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে উত্তমকুমার নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন। এটিই তাঁর অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম কোনও ছবি। কিন্তু তাঁর অভিনীত প্রথম দিকের ছবিগুলো চরম ভাবে ব্যর্থ হয়।

অভিনয়-পাগল উত্তমকুমার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চেও কাজ করেছেন। স্টার থিয়েটারে এক নাগাড়ে ‘শ্যামলী’ নাটকের ৪৮৬টি প্রদর্শনীতে তিনি অভিনয় করেন। ১৯৫৬ সালে উত্তমকুমার অভিনেতা থেকে প্রযোজক হয়ে ‘হারানো সুর’ চলচ্চিত্রটি উপহার। রাষ্ট্রপতি ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ সম্মান পায় ছবিটি। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র তিনি পরিচালনাও করেছেন। কয়েকটি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি।

এরই মাঝে ১৯৪৮ সালের গৌরী গাঙ্গুলিকে প্রেম করে বিয়ে করেন। উত্তম ততদিনে ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে নাম লেখালেও পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হননি। তাঁর ভাগ্য খুলে দেয় ‘বসু পরিবার’ ছবিটি। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি দর্শক, মিডিয়া, সমালোচক মুখরিত হয় তাঁর প্রশংসায়। প্রচুর কাজের প্রস্তাব পেতে থাকেন তিনি। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদুস্তুর অভিনেতা বনে যান। এমপি প্রোডাকশনের হাসির ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মধ্য দিয়ে প্রথম জুটি বাঁধলেন উতম ও সুচিত্রা। পরবর্তীতে উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা ছবির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয়। অগ্নিপরীক্ষা ছবি মুক্তির পর প্রমাণিত হল বাংলা ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী জুটি উত্তম-সুচিত্রা।

বাংলা সিনেমার আরেক কিংবদন্তী সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘ চিড়িয়াখানা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ‌’ অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যও তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি নিউইয়র্ক, বার্লিন চলচ্চিত্র প্রভৃতি সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসবের অতিথির সম্মানও অর্জন করেছিলেন।

চিড়িয়াখানা ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন (তখন এই পুরস্কারের নাম ছিল ‘ভরত’)। অবশ্য এর আগে ১৯৫৭ সালে অজয় কর পরিচালিত হারানো সুর ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছিলেন সমগ্র ভারতজুড়ে। সেই বছর হারানো সুর পেয়েছিল রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অফ মেরিট। ইংরেজি উপন্যাস ‘রানডম হারভেস্ট’ অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করা হয়। প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই।

উত্তমকুমার যখন সেই চরিত্র নিজের মধ্যে ধারণ করলেন, বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে স্যাটা বোস যেন রক্ত-মাংসের হয়ে উঠল। ধুতি-পাঞ্জাবি বা ধুতি-শার্ট পড়া উত্তম এই চরিত্রের দাবিতে সুটেড-বুটেড হয়ে দস্তুরমতো সাহেবি কেতার মানুষ। পাশাপাশি, হোটেলের সফিসটিকেটেড উচ্চারণ ঠোঁটের ডগায় আনলেন নিখুঁত ভাবে।

ইংরেজি উপন্যাস ‘রানডম হারভেস্ট’ অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করা হয়। প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই। কমেডি চরিত্রেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। এক গানপাগল ধনীপুত্র অভিজিৎ চৌধুরীর বাবা কমল মিত্রের সঙ্গে রাগারাগি করে বন্ধু তরুণ কুমারের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। বাবা গান পছন্দ করেন না, কিন্তু অভিজিৎ চৌধুরীর লক্ষ্য ছিল অনেক বড় শিল্পী হওয়া। নায়িকা তনুজার মামা পাহাড়ি স্যানালের বাড়িতে হৃদয়হরণ নামে ড্রাইভারের কাজ নেয়। সাবলীল অভিনয় দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন হৃদয়হরণ চরিত্রটি। ছবিটির একটি আকর্ষণীয় সংলাপ ছিল “টাকাই জীবনের সবকিছু নয়”। এছাড়াও, অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি গানও রয়েছে – “জীবন খাতার প্রতি পাতায়, যতোই করো হিসাবনিকাশ, পূর্ণ হবে না”

সঙ্গীতের প্রতিও ছিল তাঁর অসীম ভালবাসা ও আগ্রহ ছিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে এবং শ্যামল মিত্রের গানেই সবচেয়ে বেশি ঠোঁট মিলিয়েছেন উত্তম। ছবির গান রেকর্ডিংয়ের সময় শিল্পীর পাশে বসে তাঁর অনুভূতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন তিনি। এর ফলে গানের সাথে পর্দায় ঠোঁট মেলানো তাঁর পক্ষে খুবই সহজ হতো। সঙ্গীতপ্রেমী উত্তম কাল তুমি আলেয়া ছবির সবগুলো গানের সুরারোপ করেন। ছবিটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়। অভিনেতা, প্রযোজক এবং পরিচালক – সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সফল।

এই অসামান্য বর্ণময় চরিত্র , অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও অসম্ভব স্মৃতিশক্তি ছিল উত্তম কুমারের।সেভাবে কোনদিনই রাজনৈতিক শিবিরের অংশ গ্রহণ করেন নি। ফুটবল পাগল ছিলেন তবে ক্রিকেট খেলা দেখতে ছাড়তেন না। সামাজিক কাজে কোনদিনই পারিশ্রমিক না নিয়েই হাজির থাকতেন , ফলে এই ধরণের বেক্তিত্ব কোথায় আজ তাই অধরা মহানায়ক এই বাংলাতে। অভিনেতা রাহুল বর্মনের সাথে আলাপচারিতাতে চেনা অচেনার মাঝে একটু এগিয়ে দেখা , খোঁজার চেষ্টা করলাম কেন অধরা মহানায়ক !

Tags
Show More

Related Articles

Back to top button
Close